ফুটবল
টুর্নামেন্ট
গ্রীষ্মের ছুটির পর আজ স্কুল খোলার দিন,
ভন্ডূলরা একটা আনন্দ সংবাদ পেল। স্কুলের নোটিস বোর্ডে দেখা গেলো-‘‘ মতিউর রহমান ¯তৃতি
আন্ত স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট।’’
ভন্ডূলদের স্কুলের ৭ম, ৮ম ও ৯ম শ্রেণীর যে সকল ছাত্র ফুটবল
টিমে যোগ দিতে ইচ্ছুক সবাইকে আজ ছুটির পর স্কুল মাঠে ড্রিল টিচারের সাথে দেখা করতে
বলা হয়েছে।
স্কুল ছুটির পর ৭ম, ৮ম ও ৯ম শ্রেণীর প্রায় ৩০
জন উৎসাহী ছাত্র ড্রিল স্যারের সামনে লাইন করে দাড়ালো। আধ ঘন্টা শরীর চর্চা করার পর
ড্রিল স্যার প্রাথমিক বাছাই করলেন ২০ জনকে। এর মধ্যে ৭ম শ্রেণী থেকে ভন্ডূল, বিদ্যুত
ও বাবলু স্থান পেয়েছে।
ড্রিল
স্যার বললেন, “আন্ত স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্টের প্রস্তুতির জন্য সময় আছে মাত্র ৭ দিন।
এই সাত দিন পুরোপুরি ব্যবহার করতে হবে। প্রতিদিন স্কুল ছুটির পর তিন ঘন্টা শরীরচর্চা
ও প্রেকটিস চলবে।
৭
দিন পর তৈরী হবে ফাইনাল দল। এই সাত দিন ওদের উপর দিয়ে যেন ঝড় বয়ে গেলো, প্রতিদিন ছুটির পর স্কুলের
মাঠে আধ ঘন্টা শরীর চর্চা তারপর দুই ঘন্টা ফুটবল প্রেকটিস চলল। এরপর বাসায় ফিরে শরীরে
যেন আর কোন ও শক্তি অবশিষ্ট থাকে না। ভাগ্য ভালো ফুটবল টিমের ছাত্রদের স্যাররাও কয়েকদিন
একটু হোম ওয়ার্ক, ক্লাশ ওয়ার্ক থেকে রেহাই দিচ্ছেন।
আসলে এই এলাকায় আন্তঃ স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট
একটা খুব জনপ্রিয় প্রতিযোগিতা যা আশেপাশের সব উপজেলার লোক চলে আসে দেখতে। সবমিলিয়ে
দর্শক সংখ্যা হয় প্রায় তিন হাজার। প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়া যেন এলাকার গর্বের
ব্যাপার। সব স্কুলই টুর্নামেন্টটা খুব সিরিয়াসলি গ্রহণ করে।
গত বছর নন্দিপাড়া মডেল হাই স্কুল চ্যাম্পিয়ান
হয়েছে। রানার আপ হয়েছে ভন্ডূলদের স্কুল, আলী আহম্মদ হাই স্কুল।
অন্যান্য উপজেলা বা পার্শ্ববর্তী এলাকার
স্কুলগুলোও স্বভাবতই এই টুর্নামেন্টকে খুব মর্যাদাপূর্ণ মনে করে এবং যথেষ্ট গুরুত্ব
দিয়ে দল গঠন করে। তবে সবাই একটা ব্যাপারে আন্তরিক থাকে যে দলের মধ্যে যেন নিজ নিজ স্কুলের
বাহিরে কোনও ছাত্র না থাকে। যদি কোনও স্কুলের ফুটবল দলে অন্য স্কুলের অথবা হায়ার করা
কোন সদস্য পাওয়া যায় তাহলে সে স্কুল পরবর্তী পাঁচ বছর টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করতে পারবে
না। তিরিশ বছর ধরে চলতে থাকা এই টুর্নামেন্ট এই অঞ্চলের ছেলে বুড়ো সকলেরই একটা আগ্রহের
ব্যাপার হয়ে উঠেছে।
শুক্রবার বিকাল থেকে শুরু হল টুর্নামেন্ট।
প্রথম দিন খেলা হল গতবারের চ্যাম্পিয়ান নন্দিপাড়া মডেল হাই স্কুল ও ফুলপুর হাই স্কুল।
শুরুর দিন থেকেই দর্শক সমাগম অনেক বেশী।
ডিসি সাহেব এসেছেন খেলা উদ্বোধন করার জন্য।
সাথে অংশগ্রহণকারী সকল স্কুলের হেড স্যার ও স্কুল কমিটির অভিভাবকবৃন্দ। ব্যান্ড পার্টি
ও মাইক লাগিয়ে জাকজমকের সাথে শুরু হল খেলা। প্রথম দিনের খেলায়ই নন্দিপাড়া ৩-০ গোলে
ফুলপুর হাই স্কুলকে হারিয়ে দিল। ভন্ডূলরা সবাই খেলা দেখতে এসেছে। বিশেষ করে ভন্ডূল
বিদ্যুত ও বাবলু এসেছে নন্দিপাড়ার খেলার স্টাইল
ফলো করার জন্য। ভন্ডুলের আব্বুও এসেছে খেলা
দেখতে। ফুটবল ইসমাইল সাহেবের অত্যন্ত প্রিয় খেলা। ছাত্র জীবনে খুব ভালো খেলোয়ার ছিলেন।
ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় ব্রাদার্স ইউনিয়নে ১ম বিভাগে চান্স পেয়েছিলেন। কিন্তু
দুর্ভাগ্য বশত কয়েক দিন খেলার পরই বাম পায়ের হাটুতে আঘাত পেয়ে হাসপাতালে যেতে হয়। ডাক্তার
এরপর তাকে ফুটবল খেলতে নিষেধ করেন। কিন্তু ফুটবলের নেশা তার আজও যায়নি।
খেলা দেখে ফেরার সময় তিনি আজকের খেলার
কলাকৌশল ও ভন্ডূলদের আগামীকালের খেলা সম্পর্কে ওদের সাথে আলোচনা করলেন। ভন্ডূল বিদ্যুত
ও বাবলু খুবই অবাক হয়ে গেলো উনার কথাবার্তা শুনে। ওদের জানাই ছিল না আংকেল ফুটবল সম্পর্কে
এত আগ্রহী!
ভন্ডূলদের স্কুলের ম্যাচ পরদিন অনুষ্ঠিত
হল। ওরা ৩-২ গোলে ‘‘সায়রা খাতুন উচ্চ
বিদ্যালয়ের সাথে জিতে গেল। প্রতিদিন ইসমাইল সাহেব খেলা দেখতে যায়। কয়েকদিন ভন্ডূলদের
স্কুলের খেলা দেখার পর তিনি ভন্ডূলদের টিমের সবাইকে ভোর বেলা ওদের বাড়ীর সামনের
মাঠে আসতে বললেন।
‘‘দেখো, কয়েক দিন আমি তোমাদের খেলা দেখে
যা বুঝতে পারলাম, তোমাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, তোমরা সবাই মোটামুটি ভালো খেলোয়াড় এবং
প্রত্যেকে গেমে তোমরা জিতেও গেছ। কিন্তু তার মূল কারন হচ্ছে তোমাদের বিপক্ষ দল ছিল
দূর্বল। “
“এখন তোমরা
সেমিফাইনালে উঠেছো, ফাইনালে সম্ভবত নন্দিপাড়া অথবা আব্দুল আজিজ হাইস্কুলের সাথে খেলা
হবে। দুটোই খুব শক্ত দল, ওদের হারাতে হলে দলের মধ্যে খুব চমৎকার বোঝাপড়া থাকা প্রয়োজন।
বিদ্যুত ও ভন্ডূল রাইট আউট লেফট আউটে খেললে ভালো হবে। বাবলু ডিপ ডিফেন্সের একজন হবে।
আর সুমন ও রফিক স্ট্রাইকিং -এ খেললে ভালো। তবে যে যেখানেই খেলো না কেন, অবশ্যই
৫ সেকেন্ডের বেশী বল পায়ে রাখতে পারবে না। পাস দিয়ে দেবে। নইলে টিমের সমন্বয় ঘটবে না।’’
ইসমাইল সাহেব ওদের প্রেকটিস করতে বললেন।
তিনি দেখতে চান ছেলেরা সত্যিই তার কথা মন দিয়ে শুনেছে কিনা। দেখা গেল বক্তিতায় যথেষ্ট
কাজ হয়েছে।
সেমিফাইনালে ভন্ডূলদের খেলা হল ফুলপুর
হাই স্কুলের সাথে। সে খেলায় ২-১ গোলে জিতে ওরা ফাইনালে উত্তীর্ণ হল। অন্য দিকে নন্দিপাড়া
হাই স্কুল, আব্দুল আজিজ স্কুলকে হারিয়ে ফাইনালে এসেছে।
***
আজ ফাইনাল, প্রচুর দর্শক সমাগম। দুই দলের
সমর্থক অনেক, তাছাড়া গতবার নন্দিপাড়া চ্যাম্পিয়ান হওয়ায় সবাই জানে খেলাটা হাড্ডাহাড্ডি
লড়াই হবে।
খেলার শুরু থেকেই দেখা গেল বল সারাক্ষণ
নন্দিপাড়ার নিয়ন্ত্রণে। বেশী দর্শকের জন্য ভন্ডূলরা একটু নার্ভাস হয়ে পড়েছে। প্রথম
আর্ধের প্রায় দশ মিনিট ওরা বলই পেল না। ভাগ্য ভালো বাবলুর কড়া ডিফেন্স ওদের দুটি গোল
থেকে রক্ষা করল। কিন্তু ২৫ মিনিটের মাথায় নন্দিপাড়ার একটা সাদামাটা আক্রমণ থেকে ভন্ডূলরা
১-০ গোলে পিছিয়ে গেল। বাবলু ডিফেন্স থেকে বলটি ক্লিয়ার করতে গিয়ে দুভার্গজনকভাবে নন্দিপাড়ার
স্ট্রাইকারের পায়ে তুলে দেয় এবং স্ট্রাইকার রাজু চমৎকার আড়াআড়ি শটে গোলটি করে।
পুরো মাঠ দর্শকদের চিৎকারে ফেটে পড়ে। মনে
হচ্ছে আজকের সব দর্শকই নন্দিপাড়ার সাপোর্টার। এক গোল খাওয়ার পর ভন্ডূলদের সমন্বয় ভেঙ্গে
যায়। এভাবেই বিপক্ষের মুর্হুমুহ আক্রমণের মাঝেই প্রথম আর্ধের শেষ বাশি বেজে উঠে। ড্রিল
টিচার দৌড়ে ভন্ডূলদের কাছে চলে আসে।
স্ট্রাইকার
সুমন বাবলুর দিকে তাকিয়ে ধমক দেয়, ‘‘বাবলু এটা তুই কি করলি?’’
বাবলু
লজ্জায় কোনও উত্তর দিতে পারে না।
ড্রিল টিচার বলল, ‘‘কোনও সমস্যা নাই।
সত্যি কথা বলতে কি তোমরা আরোও বেশী গোল খেতে আজ। কিন্তু বাবলুর জন্যেই তোমরা বেঁচে
গেছো। অন্যরা বিপক্ষ দলের কাছে টিকতেই পারোনি তোমরা। এখনও অনেক সময় আছে, দ্বিতিয়ার্ধে
তোমাদের অনেক ভালো খেলতে হবে। একদম মনোবল ভাঙ্গবে না। রিলাক্স।”
লেবুর সরবত আর ড্রিল স্যার এর বকা খেয়ে
আলী আহমদ হাই স্কুলের ফুটবল দলের সকল সদস্য চাঙ্গা হয়ে উঠল ! মনে হলো স্যারের এই বকা
ওদের আরোও আগেই প্রয়োজন ছিল।
দ্বিতিয়ার্ধের শুরুতেই ওদের দলের স্ট্রাইকার
সুমন ও রফিক চমৎকার সমন্বয় বজায় রাখলো। ক্ষেপা ষাড়ের মত একের পর এক আক্রমণ করতে লাগল
ওরা। দ্বিতিয়ার্ধের ৫ মিনিটের সময়, মধ্য মাঠের খেলোয়ার আহসান আস্তে করে বলটি ঠেলে দেয়
লেফট আউটের বিদ্যুতের পায়ে। বিদ্যুত বলটি ধরে না রেখে লম্বা পাস করে দিল রাইট আউটের
ভন্ডূলকে। ভন্ডূল বিদ্যুত বেগে টাচ্ লাইন বরাবর বলটি নিয়ে এগিয়ে যায়।
নন্দিপাড়ার ডিফেন্সার ভন্ডূলকে আটকাতে
ছুটে আসে। তখন ভন্ডূল শরীর দুলিয়ে ডিফেন্ডারকে ধোকা দিয়ে ঠিক কর্ণার ফ্ল্যাগ থেকে বলটি চিপ্ করে
দেয় ডি বক্সের মাথায় দাঁড়ানো স্ট্রাইকার সুমনের দিকে। সুমন ক্ষিপ্র বেগে লাফিয়ে হেড
করে বলটি নন্দিপাড়ার গোলপোষ্টের জালে ঢুকিয়ে দেয় !
সারা মাঠ আবার দর্শকের চিৎকারে ফেটে পরে।
ভন্ডূলরা বুঝতে পারে ওদের দলেও প্রচুর সাপোর্টার আছে। হারানো মনোবল ফিরে পায় ওরা। বেশ
কয়েকবার আক্রমণ রচনা করার পরও আলী আহমদ হাই স্কুল আর কোনও গোল করার সুযোগ পেল না। এভাবে
আক্রমণ প্রতি আক্রমণে সময় গড়িয়ে যেতে লাগলো। গোল ১-১।
দর্শকরা ভাবছে খেলা অতিরিক্ত সময়ে গড়াবে,
কেননা, দ্বিতিয়ার্ধ শেষ হতে আর বাকী মাত্র দেড় মিনিট। ভন্ডূলদের হেড স্যার, ড্রিল স্যার
ও অভিভাবক বৃন্দ টেনশনে দাড়িয়ে গেছেন।
গোলকিপারের ছুড়ে দেয়া বল বাবলুর পা ঘুরে
মধ্য মাঠের রফিক পেল। ভন্ডূল তার রাইট অবস্থান বদল করে মাঝ মাঠে চলে এল। রফিক বলটি
ভন্ডূলকে পাস করলো। ভন্ডূলকে বাঁধা দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসে নন্দিপাড়ার স্ট্রাইকার। ভন্ডূল
বলটি পাস না করে স্ট্রাইকার কে আউট সাইড ইনসাইড ডস দিয়ে এগিয়ে যায়। ওদের দলের স্ট্রাইকার
উল্ট দিক থেকে বলটি পাস দেয়ার জন্য ওর নাম ধরে ডাকতে থাকে। কিন্তু ভন্ডুলের যেন কোনও
দিকে কোন হুশ নেই। সামনের প্লেয়ারকে কাটিয়ে ভন্ডূল ডি বক্সে ঢুকে যায়। ডিফেন্সের পায়ের
নীচ দিয়ে ছোট্ট শটে বলটি এগিয়ে হরিণের মত লাফে ডিফেন্সকে ডিঙ্গিয়ে বলটি ক্যাচ করে।
সামনে এখন শুধু গোলকিপার, গোলকিপার ভন্ডুলের মারমুর্তি দেখে ওকে বাঁধা দিতে একাই এগিয়ে
আসে। আগুয়ান গোলকিপারের মাথার উপর দিয়ে বলটি ভন্ডূল অনায়াসে গোলবক্সে প্লেস করে দেয়।
সারা মাঠের দর্শক হতম্ভম্ব হয়ে যায়। হতভম্ব
নন্দিপাড়া স্কুল, হতভম্ব অভিভাবক বৃন্দ। দ্বিতিয়ার্দের আধ মিনিট বাকী থাকতে ভন্ডুলের গোলে আলী আহমদ স্কুল ২-১
গোলে এগিয়ে গেল। সারা মাঠের দর্শক উল্লাসে ফেটে পড়ে।
নন্দিপাড়ার কিক অফের সাথে সাথেই রেফারীর
শেষ বাশি বেজে উঠল। দর্শকদের বিপুল হর্ষধ্বনি ও করতালির মাধ্যমে শেষ হল মতিউর রহমান
স্মৃতি আন্তঃ স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট।
দর্শকরা দৌড়ে এসে আলী আহমদ হাই স্কুলের
ছাত্রদের কাধে তুলে নিল। প্রাথমিক উত্তেজনা কাটার পর ট্রফি বিতরণের মাধ্যমে শেষ হল
অনুষ্ঠান।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন